বালিয়াডাঙ্গীর ধনতলা ইউনিয়কে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষনা
প্রকাশ : ০৫-০৩-২০২৩ ২২:০২
নিজস্ব প্রতিবেদক
এ, কে আজাদ : ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ৩ নং ধনতলা ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
হলিষ্টিক এপ্রোচ টু ট্যাকল চাইল্ড লেবার উইথ এমফেসিস অন ওরষ্ট ফরম অফ চাইল্ড লেবার ডেভলপড এপ্লাইড এন্ড প্রফুড সাকসেসফুল ইন সিলেক্টেড রিজিওন অফ বাংলাদেশ সিএলএমএস প্রকল্প অধীনে শিশুশ্রম নিরসন বিষয়ে কাজ করে আসার এক পর্যায়ে আজ (৫ মার্চ/২০২৩) ইং রবিবার সকাল ১১টায় বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ৩ নং ধনতলা ইউনিয়ন পরিষদ সভা কক্ষে ধনতলা ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইএসডিও আয়োজনে এবং ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন আইএলওর সহযোগিতায় ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
সভায় ধনতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমর কুমার চ্যাটাজী নুপুরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- ২ নং চাড়োল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীলিপ কুমার চ্যাটজী বাবু। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- বালিয়াডাঙ্গী থানার এস আই আশরাফুল ইসলাম।
অন্যনোদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন - দলুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমূল্য চন্দ্র সিংহ, ধনতলা ইউপি সদস্য তুষার চৌধুরী, ইএসডিও'র সিএলএমএস প্রকল্প সমন্নয়কারী মোস্তফা কামাল, ইএসডিও'র বালিয়াডাঙ্গী এরিয়া অফিসের সিএলএমএস প্রকল্পের ম্যানেজার নুর আলম।
এসময় উপস্থিত ছিলেন- বালিয়াডাঙ্গী প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদসহ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য- সদস্যাবৃন্দসহ ঝুকি মুক্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকগণ।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- ২ নং চাড়োল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীলিপ কুমার চ্যাটর্জী বাবু বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সফলতার সিঁড়ি বেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প-২০৪১ এর আগেই শিশুশ্রম মুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে।
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে' এটি মঙ্গলকাব্যের বিখ্যাত চরিত্র ঈশ্বরী পাটনির অনন্য চাওয়া। পাটনী নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের মঙ্গল ও সুখ-সমৃদ্ধির চিন্তা করেই দেবীর কাছে উক্তিটি করেন। এ আকাংঙ্খা, এ স্বপ্ন প্রতিটি মা-বাবার চিরন্তন। নিজের নাড়ি ছেঁড়া ধন এই পৃথিবীতে নিজের থেকেও ভালো থাকবে সেটিই সব মা-বাবার স্বপ্নের সর্বোচ্চ চূড়া। আবহমানকাল থেকে দেখা যায়, গ্রাম প্রধান এদেশের কৃষক বাবার সাথে তার শিশুটিও জমিতে নিড়ানি দিবে, মাথায় করে ধানের আটিটা বাড়ি নিয়ে আসবে,বাবার কোমর ধরে মইয়ের পিছনে উঠবে কিংবা বিকেলে গরুর দড়ি ধরে আইল চরাবে। এভাবেই চলতে চলতে শিশুদের মধ্যে কেউ কেউ স্কুলমুখি হয়েছে কেউ বা বাবার সাথে হয়েছে কৃষক, হয়েছে কামলা, হাল ধরেছে সংসারের। আর যে স্কুলে গেছে হয়েছে সে শহরমুখী। মাঝখানে পৃথিবী বদলে গেছে, সারা বিশ্বব্যাপী শিল্পবিপ্লব ঘটেছে। বদলে গেছে বাংলাদেশের চিত্রও।
ইএসডিও'র বালিয়াডাঙ্গী এরিয়া অফিসের সিএলএমএস প্রকল্পের ম্যানেজার নুর আলম বলেন, ২০১৩ সালের বিবিএস জরিপে দেখা যায় শিশুশ্রমে নিযুক্ত শিশুর সংখ্যা ১৭ লাখ। এর মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১০ সালে জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি প্রণয়ন করে এবং ২০১৩ সালে এ্যালুমিনিয়াম ও এ্যালুমিনিয়াম জাতীয় দ্রব্যাদি তৈরি, অটোমোবাইল ওর্য়াকসপ, ব্যাটারি রি- চার্জিং, বিড়ি ও সিগারেট তৈরি, ইট বা পাথর ভাঙ্গা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ বা লেদ মেশিন, কাচ বা কাচের সামগ্রী তৈরি, ম্যাচ তৈরি, প্লাস্টিক বা রাবার সামগ্রী তৈরি, লবণ তৈরি, সাবান বা ডিটারজেন্ট তৈরি, স্টিল ফার্নিচার বা গাড়ি বা মেটাল ফার্নিচার রং করা, চামড়াজাত দ্রব্যাদি তৈরি, ওয়েল্ডিং বা গ্যাস বার্নার, কাপড়ের রং ও ব্লিচ করা, জাহাজ ভাঙ্গা, চামড়ার জুতা তৈরি, ভলকানাইজিং, মেটাল কারখানা, জিআই শিট বা চুনাপাথর বা চক সামগ্রীর কাজ, স্পিরিট বা অ্যালকোহলজাত দ্রব্যাদি প্রক্রিয়াকরণ, জর্দা ও তামাক বাকুইবাম তৈরি, কীটনাশক তৈরি, স্টিল বা মেটাল কারখানা, আতশবাজী তৈরি, সোনার সামগ্রী বা ইমিটেশন বা চুড়ি তৈরির কাজ, ট্রাক বা টেম্পো বা বাস হেলপার, স্টেইনলেস স্টিল সামগ্রী তৈরি, ববিন ফ্যাক্টরিতে কাজ, তাঁতের কাজ, ইলেকট্রিক মেশিনের কাজ, বিস্কুট বা বেকারির কাজ, সিরামিক কারখানার কাজ, নির্মাণ কাজ, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে কাজ, কসাইয়ের কাজ, কামারের কাজ এবং বন্দরে মালামাল হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ, এই ৩৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধিত-২০১৮) অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে শ্রমে নিযুক্ত করা যাবে না, তবে ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ নয় এমন হালকা কাজ করতে পারবে। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত শিশুশ্রমের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। শিশুশ্রম নিরসনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ২২টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদ গঠন করা হয়। বিভাগীয় কমিশনার জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিগুলো শিশুশ্রম নিরসনে সামাজিক আন্দোলন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে কল কারখানাও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কল কারখানায় শিশুশ্রমের বিষয়টিকে শ্রম পরিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের মাধ্যমে ইএসডিও উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং জন সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি সংস্থা ইএসডিও'র অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠান এবং শ্রম পরির্দশনের কারণে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তাই প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রমের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।
প্রসারিত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত কর্মস্থলের পরিধি। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে ২০১৭-২০১৮ সালে তৈরি পোশাক শিল্প এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সেক্টরে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত করা হয়েছে এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আরো ২২টি সেক্টরকে ঝুঁকিপূণৃ শিশুশ্রম মুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে ট্যানারি, চামড়াজাত দ্রব্য, জাহাজ ভাঙ্গা, সিল্ক, সিরামিক ও কাঁচ শিল্প সেক্টরের মালিক সমিতির সভাপতি/চেয়ারম্যানগণের কাছ থেকে শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হয় না মর্মে প্রত্যয়ন পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে একটি জাতীয় মনিটরিং কোর কমিটি গঠন করে নিয়মিত পরিদর্শন ও ফলোআপ পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। শিল্প সেক্টরে সফলতা ধরে রেখে বাকি ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প সেক্টরে শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের পাশাপাশি আমরাও বদ্ধ পরিকর।
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষনা করা হয়।
প্রথম পর্যায়ে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নে ১৩ জন শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে আনা হয়। তাদের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং কর্মমুখি প্রশিক্ষা দেয়া হয়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এসময়ে শিশুর বাবা-মাকে মাসিক সম্মানী দেয়া হবে। সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি করা হয়।
এ বিষয়ে ইএসডিও'র সিএলএমএস প্রকল্প সমন্নয়কারী মোস্তফা কামাল বলেন, শিশুশ্রম নিরসনে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিশুশ্রম নিরসন নীতির আলোকে জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ৯টি কৌশলগত ক্ষেত্র চিহ্নিত করে ১০টি মন্ত্রণালয়/বিভাগকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ, অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থায় শিশুশ্রম নিরসন সংক্রান্ত কাজের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে বাবা-মায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাস্তব ভিত্তি পাচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত কর্মক্ষেত্রের সংখ্যা প্রসারিত হচ্ছে যা অবশ্যই উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের হাতছানি। ইএসডিও'র সিএলএমএস প্রকল্প ইতিপূর্বে ধনতলা ইউনিয়নের ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে ১৩ জনকে নিরসন করে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। তারই ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ধনতলা ইউনিয়কে ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়। ইএসডিও'র সিএলএমএস প্রকল্প নিরসনকৃত ১৩ শিশুকে অতিথিদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ব্যাগ উপহার দেন।
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@thakurgaon71.com