weather ৩৪.৬৬ o সে. আদ্রতা ৫৩% , শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বালিয়াডাঙ্গীর এক অসহায় ভ্যান চালকের আশ্রয় এখন অন্যের ঘরে

প্রকাশ : ০৪-০৬-২০২৩ ২২:২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক
এ, কে আজাদ: স্ত্রী, দুই শিশু সন্তান ছাড়া এই জগত–সংসারে আর কেউ নেই অসহায় ভ্যান চালক যাহেদ (৫৫)। স্ত্রী রিনা বেগম গত পাঁব বছর ধরে জটিল রোগে আক্রান্ত হলে সহায় সম্বল সব কিছুই বিক্রি করে স্ত্রীর  চিকিৎসা করালেও এযাবৎ তার শারীরিক কোন পরিবর্তন আসেনি। মা-বাবা আর ভাইও মারা গেছেন। পেটের দায়ে ভ্যান রিক্সা চালিয়ে তিনি কোন রকমে সংসার চালায়। যা রোজগার করে পান তা দিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানদের মুখে কিছু তুলে দেন। যেদিন রোজগার হয় না, সেদিন পানি খেয়ে রাতে ঘুমান তাঁরা। দেশে করোনা ভাইরাসে লকডাউন থাকা কালে তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু না থাকায় নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করে আসে। তার কোন বসতবাড়ীর জায়গা না থাকায় অনেকদিন ধরে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের ঘরে। খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে।
এ অবস্থায় তিনি জায়গা কিনে ঘর-বাড়ী তৈরী করবেন, তার কোনো উপায় নেই। সরকার থেকে উপজেলার আটটি ইউনিয়নে আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর তৈরী হলে তিনি একটি ঘর বরাদ্ধ পাইবার আশা করে স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের দ্বারে ঘুরে বেড়ালেও তার ভাগ্য সেই ঘর জোটেনি।
কিন্তু চরম অসহায় এই ভ্যান রিক্সা চালক যাহেদের কপালে সরকারি আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর বরাদ্ধ না হওয়ায় তার পরিবার ভেঙ্গে পড়েন।
ভ্যান রিক্সা চালক যাহেদের বাড়ি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাড়োল ইউনিয়নের ছোট সিঙ্গীয়া গ্রামের মরহুম বাঁচান মোহাম্মদের ছেলে। পাঁচ বছর ধরে তিনি জাউনিয়া
গ্রামে এবাড়ী ওবাড়ীতে বসবাস করে আসছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, জাউনিয়া গ্রামের হোটেল ব্যবসায়ী মাসুম এর ছেলে মাহাবুব আলম মানবিক কারণে তাকে থাকার জন্য একটি কাঁচা ঘর দেয়। সেই ঘরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে বসবাস করে আসছে।
বাঁশের খুঁটি আর টিনের চালার ঘরটি দেবে গেছে। টিন, বাঁশ দুমড়েমুচড়ে গেছে। ঘরের ভেতরে বৃষ্টির পানি পড়ে। পানি বয়ে যাওয়ায় নালা হয়ে আছে। ঘরের মেঝেতে পানি পরার চিহ্ন রয়েছে।
যাহের এর এক শতকও জমি নেই। বিয়ের পর থেকে স্ত্রী রিনা বেগমকে নিয়ে এখানেই থাকতেন। ভ্যান রিক্সায় গ্রামে গ্রামে
নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে তিনি  সংসার চালাতেন। তাঁর বড় ছেলে এবারে লাহীাড়ি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় হতে বিঞ্জান বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। দ্বীতিয় ছেলে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে।
যাহেদ জানালেন, বিয়ের পর মা–বাবা মারা যান। এর বছর দুই পর মারা যান বড় দুই ভাই। পাঁচ বছর আগে হঠাৎ একদিন স্ত্রী রিনা বেগম জটিল রোগপ আক্রান্ত হলে সহায় সম্বল সবকিছুই বিক্রি করে তার চিকিৎসা করিয়ে পথে বসে থাকি। তখন ছোট দুই ছেলেদের নিয়ে তিনি ভাসেন অকূল সাগরে। একপর্যায়ে সন্তানদের মুখ খাবার তুলে দিতে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। কিন্তু গ্রামে গেলে মানুষ ভিক্ষা দিতে চাইত না, কাজ করার কথা বলত। একদিন সকালে যাহেদ ভ্যান রিক্সা ভাড়া নিয়ে নিজেই চালিয়ে ভাড়া নিয়ে বেড়ানো শুরু করি । সেই পেশা এখনও করি। 
এরপর থেকে ভ্যান নিয়ে নিজে বের হয়ে আশাপাশের গ্রামে ভাড়া মারি। পেটের দায়ে 'বয়স্ক  মানুষ' ভ্যান রিক্সা চালানোর
কাজে নেমেছে, এটি গ্রামের অনেকের মনে করেন। অনেকেই ভাড়ার কাজ দেন।  একপর্যায়ে তাঁরও শ্বাসকষ্টের রোগ ধরা পরে। বেশি ভ্যান রিক্সা চালাতে পারেন না। এর পর থেকে তিনি পেটের দায়ে তিন বছর ধরে ভ্যান রিক্সা চালিয়ে সংসার চালিয়ে আসছেন।
পাঁচ  বছর ধরে সেই পেশা ধরে রেখেছেন। সারাদিন যা আয় হয়, তা দিয়েই চাল, আটা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। রাতে চুলায় আগুন দিলেই স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে খায়। যেদিন ভাড়া হয় না, সেদিন চুলা জ্বলে না। না খেয়েই ঘুমাতে হয় তাঁদের। আগের মতো এখন ভাড়া পাওয়া যায়না। তবু বাজারে যান। যখন নিজের শরীর ভালো যায় না, ঠিক এমন সময় দুই ছেলের পড়া লেখার খরচ ও সংসারের ব্যয় বহণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে, জমি কিনে থাকার ঘর তৈরী করতে না পেরে অতি কষ্টে দিন যাপন করছেন। অভাবের কারণে তার দুই ছেলের পড়া লেখার ব্যয় বহণ করতে হিমসিম খাচ্ছেন।
যাহেদ বলেন, 'যখন ভাতের জন্য সন্তানরা কাঁদে, তখন বাজার থেকে শাক, কোনো সময় লাউ এনে  সিদ্ধ করে খাওয়াই। একবেলা মরিচপোড়া দিয়ে ভাত খাইলে, দুই বেলা উপাস থাকি। ছয় মাসে একবারও মাছ খেতে পারি না।'
তবে প্রতিবেশীরা তাঁদের সহায়তা করেন বলে জানান তিনি। এরপর কোনোরকমে স্ত্রী ও দুই ছেলেদের নিয়ে জাউনিয়া গ্রামের মাহাবুব আলমের বাড়ীর একটি ঘরে আশ্রয় নেন। এখনো সেখানেই আছেন। কিন্তু ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় যাবেন, এই চিন্তায় এখন রাতে ঘুমাতে পারেন না।
যাহেদ জানান, বিগত কয়েক দফায় আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর বরাদ্ধের জন্য স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে তালিকায় তাঁর নাম দেওয়ার জন্য বলে আসতে থাকলেও এযাবৎ কেউ কোন প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
আশায় ছিলেন সরকারি সহায়তায় আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর বরাদ্ধ পেলে সেখানে উঠার। কিন্তু এখনো কোনো সহায়তা না পেয়ে বিপাকে পড়ে দিন যাপন করে আসছেন যাহেদের প্রতিবেশী আব্দুস সালাম বলেন, 'তাঁর মতো অসহায় এই গ্রামে আর কেউ নেই। তার স্ত্রী রিনা বেগম ও যাহেদ নিজে রোগী, তার ওপর তার দুটি সন্তান। এখন ঘরও নেই। এই অসহায় যাহেদ সরকারি ঘর পেলনা, তাইলে পেয়েছে কারা।' গ্রামের আরেক বাসিন্দা রুবেল জানান, তাঁদের গ্রামে যাহেদের মতো আর কেউ অসহায় নেই। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ঘর বরাদ্ধ দেওয়া একান্ত দেওয়া দরকার। ইতিপূর্বে জাউনিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় যাদের নামে ঘর বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকেই সেখানে থাকেনা।  গ্রামের কেউ পাননি।
একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক স্বীকার করেন, তাঁর গ্রামের অসহায় মানুষ কেউ সরকারের এই ঘর সহায়তা পাননি। 
ওই গ্রাম থেকে ফেরার সময় যাহেদ তাঁর ভাঙা ঘর দেখিয়ে বলেন, 'আমি ও আমার স্ত্রী অসুস্থ মানুষ। এখন ঘরও নাই। আমি মরলে দুই সন্তান কোথাই থাকে, কোয়ায় যাবে।'
এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনায় যাহের পরিবারের জন্য একটি ঘর বরাদ্ধের একান্ত আবশ্যক দেখা দিয়েছে।

-- বিজ্ঞাপন --


CONTACT

ads@thakurgaon71.com