তেঁতুলিয়ায় টিউলিপ ফুল চাষে অভাবনীয় সাফল্যে
প্রকাশ : ২১-১২-২০২৩ ১৯:৫০
নিজস্ব প্রতিবেদক
এ, কে আজাদ: উত্তরাঞ্চলের হিমালয়ের পাদদেশের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী দর্জিপাড়া গ্রামে গত বছরে টিউলিপ ফুল চাষে অভাবনীয় সাফল্যের পর এবারও বৃহৎ আকারে চাষ করা হয়েছে টিউলিপ ফুল। আর টিউলিপ ফুলের অপরুপ সৌন্দর্য্য দেখে মনে হয় এ যেন নেদারল্যান্ডের একখণ্ড ভূমি।
স্থানীয় কৃষাণীরা তাদের জমিতে দ্বিতীয়বারের মত রাজসিক সৌন্দর্য্যের ফুল টিউলিপ উৎপাদন করে প্রায় অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছেন।
টিউলিপ ফুল রোপণের পর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে লোকজন দৃষ্টিনন্দন টিউলিপ ফুলের অপরুপ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে আসছেন। শীতপ্রবণ এলাকার বিদেশী জাতের ফুল নানান রঙ্গের ফুল দেখে পর্যটকরা অভিভুত ও বিস্মিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন,সংসারে স্বাবলম্বী করা ও তাদের ক্ষমতায়নে নেয়া হয়েছে টিউলিপ চাষ প্রকল্প।
আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহযোগিতায় ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) রুরাল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফর্মেশন প্রজেক্ট (আরএমটিপি) প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ নারীদের সহায়তায় এই টিউলিপ চাষ প্রকল্প হাতে নেয়।
স্থানীয় বাজারের পাশ্পাাশি ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে এখানকার উৎপাদিত বাহারি জাতের টিউলিপ ফুল।
উত্তরের শান্ত নিরিবিলি সবুজ শ্যামলিমা পর্যটন এলাকা পঞ্চগড় জেলায় টিউলিপ ফুলের বাগান সৃষ্টি হওয়ায় পর্যটনের আকর্ষণও বেড়েছে।
দেশ বিদেশের নানা প্রান্তের লোকজন নানান প্রজাতি ও নানা রংঙ্গের বাহারি টিউলিপ ফুল দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। কেউ বা আবার সেলফিও তুলছেন। আবার কেউ ফুল কিনছেন। দেশে এই ফুলের চাহিদা থাকায় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
উচ্চমূল্যে আমদানির মাধ্যমে এ ফুলের চাহিদা পূরণ করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যা, প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে চাষীরা এবারেও সফলতা পেয়েছেন।
গত বছর টিউলিপ চাষ করে ৮ জন নারীর প্রত্যেকে ৬৫ হাজার টাকা করে আয় করেছেন। এবার কয়েকগুণ লাভের আশায় দুই একর জমিতে ২০ জন নারী উদ্যোক্তা টিউলিপ ফুল চাষ করেছেন।
চলতি মৌসুমে এক কোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রির আশা করছেন কৃষাণীসহ সংশ্লিষ্টরা। এ ফুল চাষ করে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। বর্তমানে উৎপাদিত প্রতিটি ফুল বাগান থেকে ১০০ টাকা দরে স্থানীয়ভাবে বিক্রি শুরু করেছেন।
ফুল বাগানে ক্ষুদ্র পরিসরে বিনোদন পার্ক তৈরি করে পর্যটক ও ফুলপ্রেমিদের জন্য প্রবেশ ম‚ল্য চালু করেছেন। এতে করে ফুল বিক্রি বাদেও তারা অতিরিক্ত টাকা আয় করছেন। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ সম্প্ররণের মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি খাতে যুক্ত হতে পারে টিউলিপ ফুল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তেঁতুলিয়া উপজেলার দর্জিপাড়ায় টিউলিপ বাগানটি দর্শক ও পর্যটকদের জন্য উম্মুক্ত করে দেন ইএসডিও পরিচালক (প্রশাসন) ড. সেলিমা আখতার। আগে থেকে র্দশক ও পর্যটকরা সেখানে টিউলিপ ফুল দেখতে ভিড় করেন।
বিভিন্ন সারিতে হাজার হাজার টিউলিপ ফুল ফুটেছে। কৃষাণ কৃষাণী, ভলান্টিয়াররা ব্যস্ত সময় পার করছেন। পর্যটকরা ছবি তুলছেন সেলফি তুলছেন। টিউলিপের হাসি, কৃষাণীদের হাসিমুখে হাসছেন উৎফুল্ল পর্যটকরাও। বানিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে তোলা টিউলিপ বাগান থেকে অনেকে ফুল কিনেন। কেউ আবার চারাসহ ফুলের টব কিনেন।
কৃষাণী সুমি আকতার বলেন, গতবছর ৫ শতক জমিতে পরীক্ষামূলক টিউলিপ ফুল চাষ করে্িযছলাম। বেশ ভালো হয়েছিল। সকলেই ৬৫ হাজার টাকা করে পেয়েছি। এবার ১০ শতক জমিতে টিউলিপ ফুল চাষ করেছি। আশা করি এবার লাভের পরিমাণ আরও বাড়বে। পর্যটক ও ফুলপ্রেমিদের জন্য স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে টিউলিপ হোটেল। এখানে পর্যটকরা দেশীয় স্বাদের খাবার লাফা শাক, পেলকা শাক, সুটকি ভর্তা, সিদলের ভর্তা, হাঁসের মাংশ, মাছ দিয়ে স্বল্প মূল্যে নানান জাতের খাওয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কৃষাণী মোছা মুক্তা পারভীন বলেন, আগে তো প্রশিক্ষণ পাইনি। এবার প্রশিক্ষণ দিয়েছে। চাষাবাদ সম্পর্কে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছে। গতবারের তুলনায় এবার ফুলের উৎপাদন ও সৌন্দর্য্য দুটোই ভালো হয়েছে। আশা করছি এবার ভালো লাভের মুখ দেখবো। কৃষাণী মোছা. মুক্তা পারভীন বলেন, গতবার ফুল বিক্রি করতে একটু সমস্যা ছিল। এবার ঢাকার ফুল বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফুল বিক্রি করতে পারছি। স্থানীয়ভাবে একশত টাকা করে ফুল ও কলি বিক্রি করছি। প্রচুর দর্শক আসছে। বাগানে প্রবেশ ফি ৫০ টাকা করা হয়েছে। এবার আমরা লাভবান হবো।
ঢাকা থেকে আসা সেলিনা বেগম বলেন, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের কাছে ফুলের আবেদন চিরন্তন। এ কারণে দেশের ভেতর বৃহৎ আকারে টিউলিপ চাষ দেখতে সুদুর ঢাকা থেকে ছুটে এসেছি। আমি অভিভুত মুগ্ধ। আবুল কালাম আজাদ নামে এক পর্যটক জানান, অনেকদিন ধরে শুনে আসছি তেঁতুলিয়ায় টিউলিপ চাষ করা হচ্ছে। আমি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী থেকে এবার স্বপরিবারে টিউলিপ বাগান দেখতে আসলাম। অনেক বড় বাগান অনেক ফুল দেখতে খুবই ভালো লাগছে।
ইএসডিওর টিউলিপ চাষ প্রকল্পের সমন্বয়কারী মো. আইনুল হক বলেন, নেদারল্যান্ড থেকে টিউলিপ চাষাবাদে বাল্ব বা চারা আমদানি করা হয়েছে। এক লাখ বাল্পের দাম, শেড নেট, ফেন্সিং নেট, রাসায়নিক সার, জৈবসার, কীটনাশক ও শ্রমের মূল্য মিলে ২ একর জমিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই জমিতে মাত্র দুই মাসে কৃষাণীরা উল্লেখযোগ্য আয়ের স্বপ্ন দেখছে। গতবছর কৃষাণীরা প্রত্যেকে ৬৫ হাজার টাকা করে পেয়েছেন।
তিনি বলেন, এই ফুলের বাল্ব বা বীজ রোপণের দিন হতে ১৮-২০ দিনের মধ্যে কলি আসে এবং ২৫- ৬০ দিন পর্যন্ত এই ফুল স্থায়ী থাকে। দিনের বেলা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই ফুল চাষ সহনশীল।
তেঁতুলিয়ার আবহাওয়া এমনটি হওয়ায় আমরা এখানে এই ফুল চাষের উদ্যোগ নেই। তিনি আরও বলেন, ইএসডিও কৃষাণীদের ফুল চাষাবাদে বাল্বের পাশাপাশি তাদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। চাষীদের পরিবারে আয় বাড়ানো ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, বিদেশ থেকে টিউলিপ ফুল আমদানি নির্ভরতা কমানো, পঞ্চগড় জেলাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে উপযোগী করে গড়ে তোলা।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সিনিয়র মহা-ব্যবস্থাপক (কার্যক্রম) ড. আকন্দ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দারিদ্য বিমোচন ও ক্ষুধা নিবারণে লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়নে সরকারসহ সহযোগী অংশীদের নিয়ে কাজ করছি। এবার আমরা টিউলিপের চাষাবাদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। জমির পরিমাণ ও কৃষক কৃষাণীদের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এই ফুলের কন্দ আমাদের আমদানি করতে না হয় এজন্য যশোর ও সাভারে এর বীজের উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলেও জানান তিনি।
তেঁতুলিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তেঁতুলিয়ার আবহাওয়া ও মাটি টিউলিপ চাষের উপযোগী হওয়ায় বাগানের ফলন ভালো হয়েছে। এখানে টিউলিপ চাষ কৃষি বাণিজ্যের এবং পর্যটনের নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা এখানে ঘুরতে আসছেন।পঞ্চগড়জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অনিরুদ্ধ কুমার রায় বলেন, ছোট্ট তেঁতুলিয়ার বুকে এক খণ্ড নেদারল্যান্ড। নানা রঙ্গের টিউলিপ ফুল দেখে মনটা ভরে গেছে। নিজ চোখে না দেখলে এর ভালোবাসার আবেদন বর্ণনা করা কঠিন।
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@thakurgaon71.com